১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, বিকাল ৩:৩৭
বিজ্ঞাপনের জন্য ই-মেইল করুনঃ ads@primenarayanganj.com

১৫ আগস্ট স্মৃতিচারণে কাঁদলেন আনোয়ার হোসেন

প্রাইমনারায়ণগঞ্জ.কম

১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে কলঙ্কময় একদিন। জাতির পিতাকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীণতাবিরোধী অপশক্তি। সেই সময়ের পর পর নারায়ণগঞ্জে এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বা জঘন্যতম এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ কারা করেছিলেন ? এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে মুখোমুখি হয়েছিল সে সময়ের ছাত্রনেতা, এখন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের। ৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ৭৫ সালে আমি তোলারাম কলেজের ছাত্র সংসদের জি এস ছিলাম। ১৪ আগষ্ট ততকালীণ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য একেএম শামসুজ্জোহা ভাইয়ের বড় ছেলে (প্রয়াত সাংসদ) নাসিম ওসমানের বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলাম ঢাকা ক্লাবে। সেখান থেকে খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের বাসায় নামিয়ে দেয়া হয়েছিলো। আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো পরদিন তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য। ১৫ আগষ্ট সকালে আমার বড় ভাই আমাকে জানালো বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলছে। একথা শুনে সবাই আমরা হতবিহল, ছাত্রলীগ হোক, যুবলীগ হোক, আওয়ামীলীগ হোক সবাই হতবিহবল। তখন আমরা একেএম শামসুজ্জোহার বাড়িতে গেলাম, তিনি আমাদের বললেন যে যে আপাতত সেফ সাইটে চলে গেলাম পরবর্তীতে দেখা যাক কি হয়।

ছাত্রলীগ তখন গাঁ ঢাকা দিলো, তখন ছাত্রলীগের সেক্রেটারী ছিলেন শামছুল ইসলাম ভুইয়া এখন তিনি সোনারগাঁ থানা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। তাদের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ হলো না, তারা হয়তো পালায় গেলো। আমাদের বিবেকের মধ্যে একটা তারনা দিলো, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেললো আমাদের কিছু একটা তো করা দরকার। তখন ছাত্রলীগের নেতারা কেউ নেই, আমরাই তখন জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা, আওয়ামীলীগের নেতা, কলেজ সংসদের নেতা আমরা সব আমরা মিলিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন রোকন (বর্তমান মহানগর আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি), আমি, মতিউর রহমান শিকদার, সুরেশ ঘোষ, হোসেন দোলন, হাফিজুর হোসেন ফকির, জহির উদ্দিন কাবলু, মন্টু ঘোষ, মুসলিম খান সহ কিছু লোকজন শলা-পরামর্শ করে ১০-১৫ জন মিলে সম্ভবত ১৬ আগষ্ট বা ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে একটি ঝটিকা মিছিল বের করি। সাথে সাথেই দেখি আশে-পাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মিছিল নিয়ে ডিআইটি এলাকা থেকে ২ নং রেল গেইট আসতে চাইলে পুলিশ আমাদের ধাওয়া করে, ধাওয়া খেয়ে আমরা যে যেখান দিকে পারি দৌড়ে পালিয়ে যাই।

পরবর্তীতে পুলিশ নামলো, বিডিআর নামলো আমাদের খুজতে কিন্তু আমাদের পায় নাই। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের তথা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, লেলিন, ইসমত কাদের গামা, ওবায়দুল কাদের এদের সাথে আমাদের মোটামুটি একটু যোগাযোগ ছিলো। তারা আমাদের কাছে লিফলেট পাঠাতো, এ লিফলেট আমরা বাড়িতে নিয়ে রাখতাম, গোপনে গোপলে হ্যান্ডবিলি করতাম, দেয়ালে দেয়ালে চিকা মারতাম। নির্দেশনা আসলো ৩রা নভেম্বরের জেল হত্যার প্রতিবাদে হরতাল করতে হবে। হরতাল চলাকালীন সময়ে সে জায়গায় বিডিআর নেমে আমাদের ধর-পাকড়ের চেষ্টা করলো। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি বা ছাত্র ইউনিয়নের একটি ছেলে ছিলো অরুন নামে, তাকে গ্রেফতার করা হলো, সে বিদ্যুত অফিসে কাজ করতো। আমাদের ধরার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা করতে থাকলো। সম্ভবত ৪ঠা নভেম্বর একটা গায়বী জানাযা হবে, আমরা সেই জানাযায় উপস্থিত হয়ে জানাযা দিলাম। খালেদ মোশারফের মা এর নেতৃত্বে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যাওয়ার চেস্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। আমরা পালিয়ে আসলাম।

তারপর আমরা গোপনে গোপনে মিছিল-মিটিং করতাম। সেই সময় আর্মিরা নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ঘাটি করলো। ঘাটি করার পর মেজর আহসান তোলারাম কলেজের দায়িত্ব ছিলো, কর্নেল আহসান রাইফেল ক্লাবের দায়িত্বে। তখন রোকনকে ডেকে বললো আপনাদের জি এস কে নিয়ে আইসেন। আমি গেলাম তারপর অনেক প্রশ্ন করে আমাকে গ্রেফতার করলো, আর বের হতে দিলো না। অনেক কথা বলার পর, অনেক টর্চার করলো।


টর্চারের বিবরণ দিতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন আনোয়ার হোসেন। এসময় তিনি বলেন, এরপর সাতদিন আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে ইন্টারোগেশন (জিজ্ঞাসাবাদ) করলো। জানতে চাইলো অস্ত্রের কথা, সংসদ সদস্য শামসুজ্জোহার কথা, ভাইস চেয়ারম্যান নুরু মিয়া চৌধুরী বাচ্চুর কথা, মোস্তফা সারোয়ারের কথা, কাদের সিদ্দিকীর কথা জানতে চেয়েছিলো। আমি কিছুই বলি নি। আমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলে দিয়ে দিলো। আমি ছাত্রজীবন থেকে জীবনে প্রথমবার জেলে গেলাম, আমার উপর যে টর্চার করেছে তার কারণে একসময় অসুস্থ হয়ে গেলাম, টাইফয়েড জ্বর হয়ে গেলো। আমার মা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে আমার জীবন ভিক্ষা চেয়ে দরখাস্ত করেছিলো, আমার ছেলের জীবন বাচানোর জন্য তাকে মুক্তি দেয়া হোক।

সে সময় আমাকে মুক্তি দেয়া হয়নি, চিকিতসার জন্য বাইরেও পাঠানোও হয় নি। এসময় একেএম শামসুজ্জোহা আমার চিকিতসার জন্য চেষ্টা করছে, কিন্তু চেষ্টায় কোনো কাজ হয় নাই। অসুস্থ অবস্থায় আমাকে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়। রাজশাহী জেল হইলো একটা সাওতালী পানিশমেন্ট সেল। আমরা পরে জানলাম এ বিষয়ে। পরবর্তীতে আমাদের আচরণ দেখে সন্তুষ্ট হয়ে খাপড়া সেলে পাঠালো। সেখানে অনেক নেতাকর্মীরাই ছিলো। দীর্ঘদিন রাজশাহী জেলে ছিলাম। আমার ভাইও গ্রেফতার হয়েছিলো।

৭৫ এর নভেম্বরের শেষ দিকে গ্রেফতার হয়েছিলাম, তারপর ঢাকা জেলায় জেলে ছিলাম প্রায় ৭ মাসের মতো, রাজশাহীতে ছিলাম এক বছরের মতো। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছরই কিছু বন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। সেই দিক থেকে বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ১৯ মাস জেল খাটার পর ৭৭ সালের ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর আমাকে রাজশাহী জেল থেকে ঢাকা জেলে পাঠালো সেখান থেকে আমাদের মুক্তি দেয়া হলো।

কিন্তু জেলে যাওয়ার আগে আমরা কাউকে দেখি নাই, কাউকে না। আল্লাহকে হাজির নাজির রেখে, আল্লাহকে কসম করে বলতে চাই তখন কেউ ছিলো না। ছাত্রলীগ গা ঢাকা দেয়, যুবলীগ, আওয়ামীলীগ সবাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি অনুকুলে আসতে থাকে।

তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, তখন আমরা ত্যাগের রাজনীতি করেছি। কিন্তু বর্তমানে ভাইয়ের শ্লোগান দিতে পারলে, ভাইয়ের কথা বলতে পারলে বড় রাজনীতিবীদ হওয়া যায়। তবে আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমি বঙ্গবন্ধুর দল করছি, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মিছিল করতে পেরেছি এটা আমার জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা ও সফলতা।

তিনি ক্ষোভের সুরে আরো বলেন, অনেকেই বলে ৭৫ এর পরে হেরা রাজনীতিতে আসছে। ৭৫ সালে তাদের বয়সটা কতো, তারা কিভাবে নির্যাতনের স্বীকার, তারা কিসের পোষ্টার লাগাইছে আমার নলেজে নাই। আমি তখন তোলারাম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তখন আউট, গা ঢাকা দিয়েছে, তখন আমরাই ছাত্রলীগ, আওয়ামীলীগ আমরাই জাতীয় ছাত্রলীগ, তখন আমরা কাউকে পাই নাই, কেউ ছিলো না, জোহা সাহেব তখন তো গ্রেফতারই হয়েছিলো, আলী আহাম্মদ চুনকা পৌরসভা নিয়ে ব্যস্ত। তখন আন্দোলন সংগ্রামে কেউ ছিলোনা। আল্লাহকে হাজির নাজির রেখে বলতে চাই তখন কেউ ছিলো না।

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (বিকাল ৩:৩৭)
  • ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৮ই রজব, ১৪৪২ হিজরি
  • ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (বসন্তকাল)

বাছাইকৃত সংবাদ

No posts found.